টেলিলেন্সে বাঘের মুখের ছবি যখন আমরা ধরি, তখন কেমন জ্বলজ্বল করে তার বড় বড় গোঁফগুলো। বনের রাজার গোঁফ। তাদের এই গোঁফজোড়া তো শুধু শোভাবর্দ্ধনের জন্য না। কত দরকারেই লাগে তা। আলোচনায় অভিষেক চক্রবর্তী।

আমাদের জাতীয় পশু বাঘ, তার হলুদ কালো ডোরাকাটা শরীর, পেশীবহুল দেহসৌষ্ঠব, রাজকীয় চলন, জীবনযাত্রা নিয়ে এই উপমহাদেশের জনমানসে কৌতূহলের সীমা নেই। প্রকৃতির অতুলনীয় সৃষ্টি এই প্রাণীটি যুগ যুগান্ত ধরে মানুষের মনে ভয়, কৌতূহল, বিস্ময় এবং সম্ভ্রমের সৃষ্টি করেছে।এই বাঘের নাম শুনলেই হলুদ কালো ডোরাকাটা শরীরের পাশাপাশি তার যে মুখের ছবি আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে তার অন্যতম আকর্ষণ হল নাকের নীচে পুরুষ্টু গোঁফের সারি যা বনের রাজার উপস্থিতিকে এক আলাদা রাজকীয় মাত্রা এনে দেয়। এই তথাকথিত গোঁফের উপস্থিতি কি কেবলমাত্র রাজার রাজকীয়তার প্রতীক নাকি সৌন্দর্যবর্ধন ছাড়াও এই গোঁফ রহস্যের পিছনে আছে অন্য কোন কাহিনী, এবার তার সুলুক সন্ধান করা যাক।
আমরা বাঘের মুখে গোঁফ জাতীয় যে গঠন দেখতে পাই তা আসলে গোঁফ নয়। ওগুলি এক প্রকারের স্পর্শন-যোগ্য রোমরাশি যাকে বলা হয় Tactile hair । বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এর নাম ভিব্রিসি (vibrissae) । সাধারণ দেহরোম বা চুলের সঙ্গে এর গঠনগত এবং কার্যগত পার্থক্য রয়েছে। ভিব্রিসি সাধারণ দেহরোমের থেকে লম্বা, শক্ত ও ঘন হয় এবং এদের মূল বা গোড়া তুলনামূলক ভাবে ত্বকের অনেক গভীর পর্যন্ত প্রোথিত থাকে। সাধারণ দেহরোমের তুলনায় ভিব্রিসির ফলিকলগুলি ৫-৬ গুণ পর্যন্ত বড় হয় এবং এর চারপাশে একটি করে রক্তপূর্ণ সাইনাস থাকে যাতে গুচ্ছাকারে বহু সংখ্যক ঘনসন্নিবিষ্ট স্নায়ু প্রান্ত (nerve ending) থাকে। ভিব্রিসির উপস্থিতি ব্যতীত ত্বকের অন্য কোন অংশে এত অধিক পরিমাণে স্নায়ু প্রান্ত থাকে না। এছাড়াও মানুষের গোঁফের উপস্থিতি যেমন টেস্টোস্টেরন হরমোনের তারতম্য এবং জেনেটিক কারণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, ভিব্রিসির ক্ষেত্রে এরকম কোন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নি।অর্থাৎ ভিব্রিসির উপস্থিতি বাঘ এবং অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে একটি লিঙ্গ নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য।
ভিব্রিসি প্রকৃতপক্ষে একটি অতিরিক্ত সংবেদনশীল অঙ্গের (extra sensory organ) ভূমিকা পালন করে। বাঘের ক্ষেত্রে এই ভিব্রিসি এতটাই সংবেদনশীল যে চারপাশের বাতাসের গতির সামান্য পরিবর্তন অথবা তাপমাত্রার নূন্যতম তারতম্যও তারা এর দ্বারা নির্ধারণ করতে পারে। এছাড়া চারপাশের পরিবেশের নির্ধারণ, কোন বস্তু তথা শিকারের সঙ্গে দূরত্ব,শিকারের আকার, এমনকি হাঁটার সময় পায়ের নিচের জমির প্রকৃতি ইত্যাদিও এই ভিব্রিসির সাহায্যে নির্ধারণ করা যায়।প্রতিটি ভিব্রিসির গোড়ায় অবস্থিত যে স্নায়ু প্রান্ত থাকে (nerve ending) তা proprioreceptors এর ভূমিকা পালন করে এবং গৃহীত অনূভূতিকে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রেরণ করে।
আরো পড়ুন: সিমলিপালের কালো বাঘ: আশা ও আকাঙ্খা
বাঘের শরীরে এই ভিব্রিসি কিন্তু কেবলমাত্র গোঁফের আকারে উপস্থিত থাকে না। শরীরে উপস্থিতির স্থান এবং ভূমিকা অনুযায়ী এদের পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়-
১) Supraorbital,সুপ্রাঅরবাইটাল (চোখের ওপরে)- এই ভিব্রিসিগুলি বাঘের শিকারের সময় এবং ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলার সময় চোখকে বাহ্যিক আঘাত থেকে রক্ষা করে। চোখের ওপরে আসন্ন আঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হলেই ভিব্রিসির মাধ্যমে তৈরি হওয়া অনুভূতি মস্তিষ্কে সিগন্যাল পাঠায় এবং তার প্রতিক্রিয়াতে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায় (protective blink) । যার ফলে চোখ আঘাত থেকে রক্ষা পায়।
২) Mystacial, মিস্ট্যাসিয়াল ( নাকের নীচে গোঁফ-সদৃশ) - এই গোঁফাকৃতি ভিব্রিসি গুলি বাঘের নিজের শরীরের আকৃতির সম্পর্কে তার ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে যা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বাঘের চলার পথ (route) তৈরি করতে সাহায্য করে। এছাড়া শিকারের আকৃতি নির্ণয়, মরণকামড় (killing bite) দেওয়ার উপযোগী স্থান এবং বলপ্রয়োগের মাত্রা এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। চারপাশের বাতাসের গতিপথ নির্ধারণে এই ভিব্রিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাঘ যেহেতু ambush hunter, সে লুকিয়ে শিকারের যতটা সম্ভব কাছাকাছি গিয়ে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে শেষ আক্রমণ করে । কিন্তু বাঘের ঘ্রাণ শক্তি অত্যন্ত দুর্বল তাই শেষ আক্রমণের সময় তার পক্ষে বাতাসের গতিপথ নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরী। কারণ বাঘের মূল শিকার যারা সেই ক্ষুরযুক্ত প্রাণীদের (ungulates) অধিকাংশের ঘ্রাণশক্তি প্রবল, তাই তাদের বিপরীত দিক থেকে বাতাস বইলে খুব সহজেই তারা শিকারের অপেক্ষারত বাঘের অবস্থান নির্ধারণ করে পালিয়ে যেতে পারবে। সেই কারণে বাঘ বাতাসের গতিপথ যাচাই করে শেষ আক্রমণের সময় নির্দিষ্ট করে এই গোঁফ সদৃশ ভিব্রিসিগুচ্ছের সাহায্যে। আর এই তথাকথিত গোঁফ বনের রাজার মানসিক অবস্থাও নির্ধারণ করে।শান্ত অবস্থায় এর আনত অবস্থান এবং উত্তেজিত অবস্থায় এই গোঁফগুচ্ছ মুখের দুপাশে সোজাসুজি অবস্থান করে।
৩) Tylotrich, টাইলটরিচ(সারা শরীরে) -এই প্রকারের ভিব্রিসি তুলনামূলকভাবে খর্বাকৃতি হয়। এগুলির সাহায্যে বাঘ চলার সময় তার নিজস্ব আকৃতি সম্পর্কে অবহিত হয় (spatial ability) । এছাড়াও অন্ধকারে দিক নির্ধারণে ও এগুলি সাহায্য করে।
৪) Genal and mandibular, জেনাল ও ম্যান্ডিবুলার ( চিবুক এবং মুখের গোড়ার চারপাশে) - বাঘের কাছের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হওয়ায় শিকার ধরার সময় শিকারের আকার, মরণ কামড় দেওয়ার উপযুক্ত স্থান এবং বলপ্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণে এই ভিব্রিসিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫) Carpal, কর্পাল (সামনের পাগুলির পিছনের অংশে) - এই ভিব্রিসিগুলি চাপ এবং তাপমাত্রা সংবেদনশীল। এগুলির দ্বারা বাঘ চলার সময় চারপাশের তাপমাত্রা, পায়ের নিচের মাটির প্রকৃতির তারতম্য নির্ধারণ করে এবং সেই মত নিজের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে।
বাঘের শরীরের বিভিন্ন অংশে অবস্থিত এই ভিব্রিসিগুলি কিন্তু সারা জীবন স্থায়ীভাবে থাকে না। হরিণের অ্যান্টলারের মতই তা পর্যায়ক্রমে ঝরে যায় আবার নতুন ভাবে তৈরি হয়।

আরো পড়ুন: মধ্যভারতের বাঘ ও টাইগার করিডরগুলির সংকট
দুঃখের বিষয় এই যে বাঘের শরীরের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অঙ্গটিও মানুষের লোভাতুর দৃষ্টি থেকে রেহাই পায় নি। বাঘের ছাল, দাঁত, হাড়ের পাশাপাশি বাঘের গোঁফের জন্যও চোরাশিকারিদের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে এই বিপন্নপ্রায় ( endangered) প্রাণীটি। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মহারাষ্ট্রের পেন্চ জাতীয় উদ্যানের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কোলিতমারা গ্রামে অভিযান চালিয়ে বনদপ্তর এবং রাজ্য পুলিশ একসঙ্গে ৭৭টি বাঘের ভিব্রিসি উদ্ধার করে। জেরায় জানা যায়, স্থানীয় আদিবাসী তান্ত্রিকদের মধ্যে এই বাঘের গোঁফ নিয়ে কালো জাদু করার প্রচলন আছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক অতীতে ২০২৩ এর মে মাসে মহারাষ্ট্রেরই ভান্ডারা জেলায় বাঘের গোঁফ পাচার ও বিক্রির অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ ও বনদপ্তরের যৌথ বাহিনী। জানা যায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে চীনা আয়ুর্বেদিক ওষুধের অন্যতম উপাদান হিসেবে এই বাঘের গোঁফ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কোন চিকিৎসা বিজ্ঞানেই এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

বাঘের গোঁফ প্রকৃতপক্ষে গোঁফ না হলেও এর উপস্থিতি এই ভারতীয় উপমহাদেশে বনের রাজার শৌর্য এবং সৌন্দর্য অনেকাংশেই বৃদ্ধি করে একথা অনস্বীকার্য। এছাড়া এই গোঁফ গুচ্ছকে বাঘের মত স্বল্প ঘ্রাণ শক্তির অধিকারী,একলা জীবন যুদ্ধে অভ্যস্ত প্রাণীর প্রাকৃতিক পথপ্রদর্শক বা Natural Navigator রূপে অভিহিত করাই যায়।
লেখক পেশায় প্রশাসনিক আধিকারিক। প্রাণীবিদ্যার ছাত্র ও বন্যপ্রাণী প্রেমী।
Comentários